দেশের গ্যাস খাতে বিগত তিন অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে ভর্তুকি ছিল ৬ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ ভর্তুকির প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকার ওপরে। এক বছরের ব্যবধানে গ্যাস খাতে ভর্তুকি এত বেড়ে যাওয়ার কারণ মূলত উচ্চ দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বাড়িয়ে দেয়া। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল ব্যয়সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবহার করে এ খাতের ব্যয় কমিয়ে সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। কিন্তু বর্তমান সরকারের ছয় মাস অতিবাহিত হতে গেলেও গ্যাসের আমদানি, সরবরাহ সংকট, বকেয়া, ভর্তুকি, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। বরং বিগত সরকারের দেখানো পথে হেঁটে এ খাতে আরো বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে বলে মনে করেন জ্বালানি খাত বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকারের ছয় মাস অতিবাহিত হচ্ছে। অথচ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আর্থিক চাপ কমানো যায়নি। গ্রাহকের প্রত্যাশা ছিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতে আর্থিক অনিয়ম, ক্ষতি ও পদ্ধতিগত সংস্কার করে এ খাতে ব্যয় সাশ্রয়ের পথ তৈরি করবে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু হচ্ছে তার উল্টো। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গত ছয় মাসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দৃশ্যমান কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম এ খাতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা তৈরি করা। সেই সঙ্গে অতীতে এ খাতে যেসব অসংগতি ও অনিয়ম হয়েছে সেগুলোর যথাযথ তদন্ত নিশ্চিতে কমিটি করা। যেগুলোর সুফল পাওয়া সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বকেয়া এখন প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্যাস খাতে পেট্রোবাংলার বকেয়া গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদ্যুতে বিপিডিবির বকেয়া এখন প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এ বকেয়ার সিংহভাগ রেখে গেছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এ বকেয়ার চক্র থেকে বেরিয়ে এসে সাশ্রয়ী গ্যাস বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত ও ব্যয়সাশ্রয়ী করতে এ খাতে সরকারের অন্যান্য সংস্কার কমিটির মতো আলাদা একটা সংস্কার কমিটি করা প্রয়োজন ছিল। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের শ্বেতপত্রে যেসব কথা বলা হয়েছে, সেগুলো খুবই সাধারণ। সেখানে এ খাতের ব্যয় সংকোচন ও দুর্নীতি অনিয়মের বিষয়গুলো যথাযথভাবে উঠে আসেনি। যে কারণে সরকারের ভর্তুকি বাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আগের সরকারের ধারাবাহিকতায় এগুলো চলছে। এখানে কোনো বড় পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। অথচ অন্যান্য খাতে খরচ কমিয়ে জ্বালানি খাতের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে সরবরাহ বাড়ানো জরুরি ছিল। সবকিছুতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলছে সরকার। ফলে ভোক্তাদের দুরবস্থা রয়ে গেছে।’
দেশের বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক লোকসানের বড় কারণ এ খাতে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন, যার মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতে বিগত সরকার অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করে আর্থিক দায়দেনা বাড়িয়েছে। বিশেষত বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রেখে কেন্দ্র ভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ) দেয়ার মতো আর্থিক ক্ষত তৈরি করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ চুক্তিতে নানা ধরনের অসংগতি ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এসব চুক্তি পর্যালোচনার জন্য জাতীয় কমিটি গঠন করে। যেখানে আদানিসহ বড় সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়। এরই মধ্যে এসব চুক্তির আইনি ও অন্যান্য দিক খতিয়ে দেখতে আন্তর্জাতিক আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছে এ কমিটি। কিন্তু এ পরামর্শের দুই মাস অতিবাহিত হলেও এখনো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। যে কারণে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্রয় চুক্তি বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি সরকার।
দেশের বিদ্যুৎ খাতে বিশেষ আইনের মাধ্যমে ভারতীয় আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ চুক্তি করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এ চুক্তিতে জ্বালানি ব্যয়সহ নানা ধরনের অনৈতিক সুবিধা লুফে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল এ চুক্তি বাতিল করা। কিন্তু চুক্তির আইনি জটিলতার বিষয়টি জানিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি সরকার। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে আদানির বিরুদ্ধে ঘুস ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় গত বছরের নভেম্বরে আদানির সঙ্গে করা ২৫০ কোটি ডলারের চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয় আফ্রিকার দেশ কেনিয়া।
আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তিসংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বেশকিছু কেন্দ্রের বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি একটা সুপারিশ দিয়েছে। সেখানে তারা আন্তর্জাতিক আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেয়ার কথা বলেছে। সেটা নিয়ে কাজ চলছে। তবে চাইলেই তো যেকোনো চুক্তি বাতিল করার আইনি কোনো সুযোগ নেই। আদানির কেন্দ্র নির্মাণ চুক্তিতে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হলে এবং সেটা প্রমাণিত হলে তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু হুট করে তো চুক্তি বাতিলের সুযোগ নেই।’
বিদ্যুৎ খাতে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি রাখা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এ ভর্তুকির বড় কারণ বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম মূল্যে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা। বর্তমানে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় গড়ে ১২ থেকে ১৩ টাকা। আর তা গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে বিক্রি করা হচ্ছে ৮ টাকা ৪০ পয়সা। প্রতি কিলোওয়াটে মূল্যের এ পার্থক্য দীর্ঘদিন ধরে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ পার্থক্য কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হলেও এখনো পারেনি। যে কারণে বিদ্যুৎ খাতে আওয়ামী লীগ সরকারের দেয়া ভর্তুকি বরাদ্দ ঠিক রেখেই চলতে হচ্ছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অদক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে যথাযথ কেন্দ্র বিশ্লেষণ করলে উৎপাদনসাশ্রয়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানোর সুযোগ ছিল বিপিডিবির।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ঠিক রাখতে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে সরকার। অতীতে এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সংকটে পড়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। স্থানীয় গ্যাসের সংস্থান না বাড়ানোর কারণে অতিমাত্রায় এলএনজি-নির্ভরতা এ ক্ষতি বাড়িয়ে তুলেছিল। বর্তমানে জ্বালানি বিভাগ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ ঠিক রাখতে এলএনজি আমদানি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বাড়িয়েছে। এ বৃদ্ধি জ্বালানি খাতের নিরাপত্তাহীনতা আরো বাড়িয়ে তুলবে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির শুরুর পরের ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ভর্তুকি ছিল ৬ হাজার কোটি টাকার মতো। বর্তমানে গ্যাসের ঘাটতি মোকাবেলা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে স্পট থেকে এলএনজি আমদানি দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়েছে সরকার। এতে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্যাস খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ১৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। আর ২০২৫ সালের পঞ্জিকা বছর হিসাব করলে ভর্তুকি ২২ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়াবে।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়। এর মধ্যে অন্যতম বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বিশেষ আইন বাতিল। এছাড়া নির্বাহী আদেশ বাতিল করে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) ফিরিয়ে দেয়া। এছাড়া আওয়ামী লীগ আমলে করা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষ আইনের আওতায় হওয়া চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য জাতীয় কমিটি করে অন্তর্বর্তী সরকার। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোয় চেয়ারম্যান হিসেবে সচিবদের সরিয়ে দেয়ার কাঠামোগত পরিবর্তনও আনা হয়। এছাড়া বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের, বিশেষত ফার্নেস অয়েল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ট্যারিফ পর্যালোচনার উদ্যোগও নেয়া হয়। বেসরকারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি সামিট গ্রুপের এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ চুক্তি বাতিল করে দেয় এ সরকার। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেয়া গ্যাস অনুসন্ধানে ১০০ কূপ খননের পরিকল্পনা এ সরকার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
গত ছয় মাসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিলেও এ খাতের সুফল বয়ে আনবে, এমন উদ্যোগ নিতে পারেনি। যে কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যয় কমাতে পারছে না সরকার। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, যা এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি সুফল দেবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আর্থিক চাপ কমাতে বেশকিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এ খাতে উন্মুক্ত দরপত্রের সুযোগ তৈরি করা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোর বোর্ডে পরিবর্তন আনা। এছাড়া অনিয়ম-দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে জাতীয় রিভিউ কমিটি, ট্যারিফ পর্যালোচনায় কমিটিসহ নানা পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে এ খাতে অর্থনৈতিক চাপ ও ব্যয় সাশ্রয় না হওয়ার পেছনে বড় কারণ মূলত বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ বকেয়া। এ বকেয়া এ খাত পরিচালনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।’
উপদেষ্টা মনে করেন বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপ তৈরির বড় কারণ উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে বিদ্যুৎ বিক্রি করা। উৎপাদন খরচ যেখানে গড়ে ১২-১৩ টাকা, সেখানে গ্রাহক পর্যায়ে তা গড়ে বিক্রি করা হচ্ছে ৮ টাকা ৪০ পয়সায়। এ প্রাইস গ্যাপ মেটানো হচ্ছে ভর্তুকি দিয়ে। এ চাপ সাংঘাতিক। তবে এ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিদ্যুৎ খাতে মৌলিক যেসব পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তাতে এ বছরের শেষের দিকে অর্থনৈতিক সাফল্য কিছুটা দেখা যাবে।